স্লিপিংব্যাগ কেনার আগে জেনে নিন

স্লিপিংব্যাগ

স্লিপিংব্যাগ কেনার আগে জেনে নিন কি কি দেখে কিনবেন আর কোনটা আপনার প্রয়োজন।

ব্যাকপ্যাকিং ও আউটডোর ক্যাম্পিং এর জন্য স্লিপিংব্যাগ খুবই অপরিহার্য একটু গিয়ার। অনেকেই হয়তো স্লিপিংব্যাগ নিয়ে ট্রিপ করতে হবে শুনেই ভ্রু কুঁচকে ফেলেছেন, আমাদের দেশে সাধারনত স্লিপিংব্যাগ বলতে  জনগন  যেগুলো চিনে (বাইতুল মোকাররম ও কাকরাইল এ পাওয়া যায়) তা মোটেও ব্যাকপ্যাকিং এর উপযোগি স্লিপিংব্যাগ না, ওগুলো বলে চলে সেলাই করা একটা লেপ বা কম্বল।

নিজের জন্য সঠিক স্লিপিংব্যাগটি বাছাই করার জন্য আমাদের জানতে হবে স্লিপিংব্যাগের সবচেয়ে জরুরি তিনটি বিষয়:

  • তাপমাত্রার রেটিং
  • শেপ ও সাইজ
  • কি ম্যাটেরিয়ালে তৈরী

তাপমাত্রার বা টেম্পারেচার রেটিং:

গায়ের জামা যেমন একেক পরিবেশে ও সিসনে একেক রকমের হয়, স্লিপিংব্যাগও তেমন একেক তাপমাত্রা বা পরিবেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হয়। আমি যেই স্লিপিং ব্যাগ দিয়ে বান্দারবনে ক্যাম্পিং করব সেটা দিয়ে আমি এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে মাইনাস তাপমাত্রা ঠান্ডায় থাকতে পারবো না, আবার একই ভাবে মাইনাস তাপমাত্রার উপযোগি ব্যাগে আমি বান্দরবানে ঘুমাতে পারবো না, গরম লাগবে।

স্লিপিং ব্যাগে সাধারনত রেটিং দেয়া থাকে কমফোর্ট লেভেল ও লোয়ার লিমিট/ এক্সট্রিম লিমিট এইভাবে। তাপমাত্রা নির্ভর করে ভেতরের ফিলিং কত পুরু, শেল ম্যাটেরিয়াল বা উপরের কাপড়ের কোয়ালিটি এবং ব্যাগের শেপের উপর। ফিলিং যত ফ্লাফি বা ফুলাফুলা থাকবে তত ভালো। খেয়াল রাখতে হবে যে স্লিপিং ব্যাগ নিজে কোন গরম তৈরী করেনা, শুধুমাত্র আপনার শরীরের গরম টাকে আটকে রাখে বাইরের ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে।

কমফোর্ট লেভেল: একজন পূর্নবয়স্ক নারী সর্বনিম্ন এই তাপমাত্রায় আরামে ঘুমাতে পারবে। এর নীচে তাপমাত্রা নামলে ঠান্ডা লাগবে।  

লোয়ার লিমিট: একজন পূর্নবয়স্ক পুরুষ সর্বনিম্ন এই তাপমাত্রায় আরামে ঘুমাতে পারবে। এর নীচে তাপমাত্রা নামলে ঠান্ডা লাগবে।

কাজেই আমাদের কেনার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন স্লিপিংব্যাগটি আমি যেই পরিবেশে ক্যাম্পিং করব তার তাপমাত্রা কাভার করতে পারে। উদাহরন: যদি পাহাড়ে বেশিরভাগ সময় আমি জুম ঘরে বা পাহাড়িদের ঘরে ঘুমাই তাহলে সেখানে তাপমাত্রা রাতের বেলা ১২-১৫ নেমে যাওয়ার কথা, সেই হিসাবে আমার স্লিপিংব্যাগকে অবশ্যই নিম্নে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে হবে। (মেয়েদের দেখতে হবে কমফোর্ট লেভেল, ছেলেদের কমফোর্ট লেভেল, আর না পাওয়া গেলে লোয়ার লিমিট)

তাপমাত্রা যখন বেশি থাকবে তখন ব্যাগের চেন খুলে বাতাস চলাচলের ব্যাবস্থা করলে গরম কম লাগবে।

শেপ ও সাইজ:

স্লিপিং ব্যাগ সাধারনত দুই শেপের হয়।

  • সম্পুর্ন চারকোনা শেপ, এটাকে এনভেলোপ বা রেকট্যান্গুলার শেপ বলা হয়ে থাকে। সাধারনত সামার স্লিপিং ব্যাগ (০ ডিগ্রি সে: এর উপরে) গুলো এই শেপের হয়ে থাকে।
    মামি স্লিপংব্যাগ গুলি হয়ে থাকে মানুষের শরীরের মত শেপের। পায়ের দিকে চাপা হয় ও মাথা ঢেকে রাখা যায়। এই ধরনের ব্যাগ গুলি তাপমাত্রা খুব ভালো ভাবে ধরে রাখতে পারে শুধুমাত্র এই শেপের কারনে। পায়ের দিকে চাপা থাকায় অনেক কম বাতাস আটকে থাকে সেখানে যা কম সময়েই শরীরের গরমে গরম হয়ে যায় ফলে শীত কম লাগে। পায়ের দিকে চাপা থাকার কারনে প্যাক করার পর তুলনামুলক ভাবে চারকোনা ব্যাগের থেকে কম জায়গা নেয় ও ওজনে হালকা হয় কিছুটা। সবদিকদিয়ে ভালো হলেও যারা হাত পা মেলে ঘুমাতে সাছ্যন্দ বোধ করেন তাদের এই ধরেনের ব্যাগে ঘুমাতে কষ্ট হয়, সেই দিক দিয়ে চারকোনা গুলো কিছুটা আরামের। চরম ঠান্ডা (০ এর নীচে) আবহাওয়ার জন্য সবসময় স্লিপিংব্যাগ মামি শেপের হয়ে থাকে।

 

কিছু কিছু স্লিপিং ব্যাগ পাওয়া যায় চারকোনা ও মামি শেপের মাঝামাঝি, যেখানে মাথার হূড থাকে ও পায়ের দিকে পুরা চাপা না হয়ে সামান্য চাপা থাকে। যাদের মামি শেপ পছন্দ কিন্তু ঘুমাতে সাছ্যন্দ বোধ করেন না তারা এইগুলি ট্রাই করে দেখতে পারেন।

 


 

  • কি ম্যাটেরিয়ালে তৈরী:

ফিলিং:

ব্যাকপ্যাকিং ও ক্যাম্পিংএর জন্য আউটডোর স্লিপিংব্যাগে দুই ধরেনর ফিলিং ব্যাবহার হতে পারে, ডাউন অথবা সিনথেটিক ফাইবার।

  • ডাউন: হাসের বা পাখীর পালকের নীচের নরম লোম থেকে তৈরী। ওজনে খুবই কম হয়ে থাকে। প্যাক করলে সাইজেও অনেক ছোট হয়। সাধারনত ৬০০ ফিল পাওয়ারের ডাউন ব্যাবহার করা হয়। ফিল পাওয়ার হচ্ছে এক আউন্স ওযনের ডাউন কত কিউবিক ইন্চ যায়গা দখল করে তার মাপ। ফিল পাওয়ার যত বেশী ব্যাগ তত হালকা ও ফুলাফুলা হবে। এক্সট্রিম তাপমাত্রার সব স্লিপিংব্যাগ ও জ্যাকের গুস ডাউন বা ডাক ডাউন দিয়ে তৈরী করা হয়। খুব ভালো ইনসুলেশন হলেও দাম অনেক বেশি। সাধারনত ডাউনের তৈরী স্লিপিংব্যাগ ২০,০০০ টাকা থেকে এন্ট্রি লেভেলের গুলো শুরু হয়। ডাউনের আরেকটা সমস্যা ডাউনের তৈরী কোন কিছু ধোয়ার জন্য বিষেষ প্রনালী ও সাবান আছে যা আমাদের দেশে সহজ লভ্য না। এছাড়া কোন কারনে ডাউনের স্লিপিংব্যাগ ভিজে গেলে তা শুকাতে অনেক সময় লাগে ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। শুধুমাত্র এক্সট্রিম তাপমাত্রার এক্সপিডিশনের জন্য এই ধরনের ব্যাগ ঠিক আছে, আমাদের দেশে যেহেতু তাপমাত্রা +৫ এর উপরে থাকে তাই আমাদের উপযোগি না।
  • সিনথেটিক ফাইবার: সিনথেটিক (পলিয়েস্টার) এর ফোমের মত এই ফিলিংটা সাধারনত জ্যাকেট ও মডারেট স্লিপিংব্যাগে ব্যাবহার করা হয়। ডাউনের থেকে ওযন ও সাইজ বেশি হয়ে থাকে। কমদাম ও সাধারন ভাবে ধোয়া যায়। মাপা হয় গ্রাম স্কয়ার মিটার বা জি দিয়ে। উদাহারন ২০০জি মানে ১ স্কয়ারমিটার এই ফাইবারের ওজন হবে ২০০ গ্রাম। সাধারনত ১৫০০-২৫০০ টাকার ভেতরে আমাদের তাপমাত্রার উপজোগি স্লিপিং ব্যাগ পাওয়া যায়।

 

আউটার শেল:

স্লিপিং ব্যাগের উপরের কাপড় টাকেই শেল বলা হয়। সাধারনত পলিয়েস্টার বা রিপস্টপ নাইলনের হয়ে থাকে। ভালো স্লিপিং ব্যাগের উপরের শেল ওয়াটার রিপেলেন্ট হয়ে থাকে যেনো ভেতরের ফিলিং ড্যাম্প না হয় শ্যাতশ্যাতে পরেবিশে। ব্যাগের শেল ওয়াটার রিপেলেন্ট কিনা বুঝতে এক ফোটা পানি ফেললে পানি ফোটা ফোটা হয়ে গড়িয়ে পড়বে, আর যদি কাপড় পানি শুষে নেয় তাহলে বুজতে হবে ওয়াটার রিপেলেন্ট না। পলিওয়েস্টারের তুলনায় রিপস্টপ নাইলন বেশি টেকশই, নরম ও ওজনে হালকা হয়ে থাকে।

 

লাইনিং:

ভেতরের কাপড়টাকে লাইনিং বলা হয়। সাধারনত নরম নাইলন অথবা পলিয়েস্টার এর হয়। পলিয়েস্টারের তুলনায় নাইলন লাইনিং বেশি আরামদায়ক ও নরম হয়ে থাকে।

টিপস: একেক জনের শরীরের তাপমাত্রা একেক রকম। একই স্লিপিং ব্যাগে কেই আরাম আবার কেউ কষ্ট পেতে পারে। নীচের কিছু জিনিষ খেয়াল রাখতে হবে:

    •  স্লিপিং প্যাড বা কোন কিছুর উপর শুলে ঠান্ডা অনেক কম লাগবে, কারন শরীরের চাপে ফিলিং চ্যাপ্টা হয়ে থাকাতে স্লিপিংব্যাগের নীচের দিকে ঠান্ডা লেগে থাক.
    •  গরম যেহেতু আপনার শরীর তৈরী করবে তাই পেট ভরা থাকতে হবে ও পরিমান মত পানি পান করতে হবে। খালি পেটে ঘুমাতে গেলে ঠান্ডা লাগার সম্ভবনা অনেক বেশী।
      • আর মনে রাখবেন স্লিপিংব্যাগ কেনার সময় যে কাপড়ের থলে তে থাকে (স্টাফ শ্যাক বা কমপ্রেশন শ্যাক) তা শুধুমাত্র ট্রেকিং বা চলাফেরার সময়ের জন্য। যখন ব্যাবহার হবে না তখন খুলে জামা কাপড়ের মত ভাজ করে রাখতে হবে। প্যাকের ভেতরে চেপে রাখলে ফিলিং এর ফুলাফুলা ভাব কমে যাবে।

ফজলে রাব্বি

৪ ডিসেম্বর ২০১৪

 

নীচের স্লিপিংব্যাগ গুলি দেখতে পারেনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *