তাবুর সিজন ও ম্যাটেরিয়াল

তাবুর সিজন ও ম্যাটেরিয়াল

তাবুর সিজন ও ম্যাটেরিয়াল

অনেকেই আমরা আজকাল তাবু বা অন্যান্য আউটডোর গিয়ার কেনার সময় ভুল ধারনা থেকে শুধুমাত্র দাম এর ব্যাপারটা দেখি। আর সকল পন্যের মতই তাবুও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের। দাম কম মানেই খারাপ বা দাম বেশি মানেই ভালো এমন টা মনে করার কারন নাই। চৈত্রের গরমে যেমন আপনার দামি কোট টা যতই দামি হোক আরাম দিবে না, তেমনি মাঘের শীতে শুধু টি-শারট কাজে দিবে না। তাবুর ভালো মন্দ জানতে হলে আগে জানতে হবে তাবুর সিজন, ম্যটেরিয়াল, পোল এইসব ব্যাপারে।

প্রায়ই আমার কাছে বিভিন্ন জনে জানতে চান “কম দামে ভালো তাবু কোনটা পাওয়া যায়”। এই কম দাম ব্যাপারটা পুরাটাই আপেক্ষিক, একেক জনের কাছে কম দামের মাপকাঠি একেক রকম, তাই এই ব্যাপারটা রেখে আগে “ভালো” ব্যাপারটা বোঝার চেস্টা করি আসেন। ভালো তাবু বা খারাপ তাবু বিষয়টাও নির্ভর করে ব্যাবহার ও প্রয়োজনের উপর, একে একে তাবুর বিভিন্ন বিষয় দেখলেই পরিস্কার হয়ে যাবে।

প্রথমে একটা উদাহারন দেই, আসেন কম দামের ভেতর ৪ সিটের ভালো একটা গাড়ি দেখি। এখানে একটা গাড়ি দরকার যেটাতে ৪ জন বসতে পারবেন। এখন গাড়িটা ৮ লাখ টাকার মারুতি হতে পারে, আবার ২০ লাখের টয়োটা সেডান হতে পারে। দুইটাতেই ৪ জন বসা যায়। তাহলে দামের এই পার্থক্য কেন? পার্থক্য আরাম, কতদিন টিকবে বা কি ধরনের মেটেরিয়ালে তৈরি তার জন্যে। এখন ২০লাখ দিয়ে ৪ জনের সেডান গাড়ি কিনলেই যে ভালো হবে তা না, এই গাড়ি নিয়ে আপনি তো অফ-রোডে, বনে বাদাড়ে চালাতে পারবেন না, তাহলে আপনার লাগবে একটা ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি। তাহলে প্রায় কোটি খানিক লেগে যাবে ৪ জনের একটা অফ-রোডে চলার মত ফোর হুইল ড্রাইভ এসুভি কিনতে। এইখানেও আপনি মাহেন্দ্র কিনতে পারেন বা ল্যান্ড রোভার নিতে পারেন, নির্ভর করে আপনি কি কোয়ালিটি চাচ্ছেন। আবার বেশী দাম দিয়ে একটা ল্যান্ডরোভার কিনে গলিতে চালাতে চালাতে তেলের খরচ দেখে ভয় হতে পারে, মনে হতে পারে টয়োটা স্টারলেট টাই ভালো ছিল।

এইবার আসেন তাবু তে। আমরা বেশিরভাগ মানুষ তাবু খুজি “ওয়াটার প্রুফ” ও “কত জনের” এই ২ টা ব্যাপার দেখে। প্রথম টার্মটা খুবই হাস্যকর, অবাক হচ্ছেন? হ্যা এইটা একটা মার্কেটিং টার্ম ছাড়া কিছুই না। বেশিরভাগ মানুষ যারা অনেক অনেক কম দামে ভালো ওয়াটার প্রুফ তাবু কিনেন তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্যেই এমন ভাবে বিক্রি করা হয় “2 person waterproof tent”

তাহলে? তাবু কি দেখে কিনব? ভালো তাবু কোনটা?

কত জন থাকবে এক তাবুতে সেটা ঠিক হয়ে গেলে কাজ একটু কমে গেলো, ধরে নেই ২ জন থাকবে। প্রচলিত ভাবে ডোম টেন্ট ইদানিং বেশী ব্যাবহার হয়, তাই বিভিন্ন ধরনের তাবু না দেখে আমরা ডোম টেন্ট নিয়ে আলোচনা করি।
কত জনের ঠিক হয়ে গেলে এর পর নীচের জিনিস গুলো দেখতে হবেঃ
১। সিজন
২। মেটেরিয়াল স্পেক (পোল, ফ্যাব্রিক ইত্যাদি)

আমরা যারা সিজন একটু একটু বুঝি তারা সবসময় খুজি ৩ সিজন বা ৪ সিজনের তাবু, সবার আগে আসেন জেনে নেই তাবুর সিজন রেটিং টা আসলে কিঃ

আমাদের দেশে আমরা ৬ টা ঋতু হিসাব করলেও সারা দুনিয়াতে আসলে মুল ৪ টা ঋতুতে সারা বছরকে ভাগ করা হয়। উইন্টার, স্প্রিং, সামার ও অটাম। আমাদের বোঝার সুবিধার জন্যে তাবুর সিজনগুলি কি বুঝায় তা নীচে দেয়া হলঃ

  • ১ সিজনঃ ড্রাই বা সানি ওয়েদার এর জন্যে।
  • ২ সিজনঃ হালকা বৃষ্টি ও হালকা বাতাস সহ্য করতে পারে।
  • ৩ সিজনঃ তুমুল বৃষ্টি ও বাতাস, সাথে হালকা তুষার সহ্য করতে পারে।
  • ৪ সিজনঃ ভারী বৃষ্টি ও ভারী তুষারপাত, সাথে জোর বাতাস সহ্য করতে পারে।

এছাড়াও ৫ সিজন বা এক্সট্রিম কন্ডিশনের জন্যে টেন্ট হয়, যেগুলি অনেক বেশী তুষারপাত ও ঝড় সহ্য করতে পারে। কিন্তু এইগুলি সাধারনত এক্সট্রিম কন্ডিশনে যেমন আর্কটিক বা পাহাড়ের অনেক উপরে ব্যাবহারের জন্যে।

অনেক খানেই টেন্ট এর রেটিং বাড়ায়ে বলা হয় বিক্রি বেশির উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে চাইনিজ কোম্পানি গুলির এই ব্যাপারে বেশ খ্যাতি আছে। আসেন শিখে নেই কি কি দেখে রেটিং কিছুটা হলেও সহজে বুঝা সম্ভবঃ

১ বা ২ সিজনঃ

বুঝার তেমন কিছু নাই, পাতলা এক লেয়ারের তৈরি হবে, সস্তা হবে, পোল ৬ থেকে ৭ মিমি ফাইবারের হবে। সেলাই এর ভেতরের দিকে কোন সিল করা থাকবে না। ছোট্ট করে ভেন্টিলেশন এর ব্যাবস্থা থাকতে পারে।

 

 

 

 


 

৩ সিজনঃ

সাধারনত দুই লেয়ারের হবে, একটা টেন্ট বডি থাকবে, আরেকটা ফ্লায়ার থাকবে।  পোল গুলি বেশ মোটা (৮-৯ মিমি) ফাইবারের হবে। ফ্লায়ার ও ফ্লোর এর কাপড় ওয়াটার প্রুফ হবে ১৫০০মিমি থেকে ৩০০০মিমি রেটিং এর, সেলাইগুলি হিট বা প্রেশার সিম সিল করা থাকবে যেন পানি সেলাইয়ের গোড়া দিয়ে না ঢুকতে পারে।  টেন্ট বডি তে এনাফ ভেন্টিলেশনের ব্যাবস্থা থাকবে বা মেশ/নেট থাকবে যেন ভেতরে কন্ডেন্সেশন বা ঘেমে যাওয়া কম হয়। গাই রোপ থাকবে।



৪ সিজনঃ

৩ সিজনের মতই, কিন্তু পোল অনেক মজবুত হবে, ফাইবার এর বদলে এলয় এর পোল থাকবে, কিছু ক্ষেত্রে সাধারন ২ টা পোলের বদলে বেশী পোল থাকবে বাতাস ও তুষারের ভার সহ্য করার জন্যে। ফ্লায়ার মাটি পর্যন্ত থাকবে, ফ্লোর ও ফ্লায়ার ৩০০০-৪০০০মিমি ওয়াটার প্রুফ রেটিং এর হবে। ভেন্টিলেশন ফ্ল্যাপ নাও থাকতে পারে, থাকলেও বন্ধ করার ব্যাবস্থা থাকবে। গাই রোপ থাকবে।

** কিছু কিছু ৩/৪ সিজন তাবু ওজন কমানোর জন্যে এক লেয়ারের হয়ে থাকে, তবে সেগুলি ব্রিদেবল ওয়াটার প্রুফ কাপড়ের তৈরি হওয়াতে দাম বেশী হয়ে থাকে অনেক। সেইগুলি স্পেশাল তাবু, আজকের এই আলোচনার বাইরে।

শুরুতেই যেটা বলেছিলাম, ওয়াটার প্রুফ কথাটা ২-৩-৪ সিজন সব তাবুতেই প্রযোজ্য, তবে ২ সিজনের ওয়াটার প্রুফ আর ৪ সিজনের ওয়াটার প্রুফ এক না। আবার সব ৩ সিজন তাবুর ওয়াটার প্রুফ এক এইটাও ঠিক না।  তাবুর ওয়াটার প্রুফ এর মাত্রা বুঝানো হয় কাপড়ের হাইড্রস্ট্যাটিক হেড প্রেশার (মিলিমিটার এ) রেটিং দিয়ে। এইটার মানে কাপড়টা কতটুকু পানির প্রেশার নিতে পারে লিক করার আগ পর্যন্ত, এই রেটিং যত বেশী হবে কাপড় তত বেশী ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো বৃষ্টি সহ্য করতে পারবে। এখন ৩ সিজনের একটা তাবু যেটার রেটিং ২০০০মিমি সেটার থেকে ৩০০০মিমি রেটিং এর একটা ৩ সিজন তাবু বেশী ওয়াটার প্রুফ হবে।

 

তাবুর কাপড় ওয়াটারপ্রুফ করা হয় বেশ কয়েকভাবেঃ

পলি ইউরেথিন কোটিং PU (poly Urethane)-

  • পলিয়েস্টার বা নাইলনের কাপড়ের ভেতরের দিকে পাতলা একটা কোটিং করা থাকে পলি ইউরেথিনের। দামে সস্তা অথবা ১-২ সিজন তাবুতে সাধারনত এটাই ব্যাবহার করা হয়। এই কাপড়ে বৃষ্টিতে কাপড়ের বাহিরের দিক ভিজে থাকে আর শুকাতে বেশ সময় লাগে। ভেজা অবস্থায় প্যাক করে রাখলে খুব তাড়াতাড়ি এই লেয়ার নস্ট হয়ে যায়। এছাড়া ভেজা কাপড়ের ওজন তো বেড়ে যায়ই, যা বহন করতে বেশ কষ্ট।

পি ইউ এর এই সমস্যা দূর করতে ভালো মানের তাবুর কাপড়ের বাহিরে ডিউরেবল ওয়াটার রিপেল্যান্ট (DWR) কোটিং ব্যাবহার করা হয়। এই কোটিং এর কারনে পানি কচু পাতার মত গড়ায়ে পড়ে যায়, কাপড়ে ঢুকে না। এই ধরনের কাপড় একটু ঝাড়া দিলেই সব পানি পড়ে যায় আর কিছুক্ষণের ভেতরেই শুকিয়ে যায়, এর ফলে ক্যাম্প শেষে তাড়াতাড়ি প্যাক করা যায়। এই লেয়ার বেশী ব্যাবহার বা বছর খানেক পরে নস্ট হয়ে যায় ধীরে ধীরে, এর পর আবার নতুন করে DWR স্প্রে করে নেয়া যায় প্রয়োজনে। ৩/৪ সিজনের তাবুতে এই ধরনের কাপড়ই থাকে সাধারনত। তাবুর ফ্লোরে এই কোটিং থাকে না তাই ব্যাবহার করা হয় না। ফ্লোরে সাধারনত মোটা পি ইউ লেয়ারের কাপড় ব্যাবহার করা হয়ে থাকে।

 

 


সিল নাইলন বা সিলিকনঃ

উন্নত তাবু আজকাল সিল নাইলন বা সিলিকন ফ্যাব্রিক দিয়ে তৈরি হয়। অনেক সময় সিলিকন কোটিং বলা হলেও এটা আসলে কোটিং না, কাপড় তৈরির সময় তরল সিলিকনের ভেতর দিয়ে কাপড় টাকে নেয়া হয়, ফলে তরল সিলিকন কাপড়ের সুতার ভেতরেও ঢুকে যায়, আর দুই পাশে পাতলা একটা লেয়ার তৈরি করে। পুরাটা কাপড়ের মত না হয়ে অনেকটা প্লাস্টিক এর মত চেহারা হয় (পেয়াজের খোশার সাথে মিল আছে কিছুটা)। প্রক্রিয়াটা অনেকটা গ্লাস ফাইবার এর মত। এই ম্যাটেরিয়াল যেমন ওজনে হালকা, তেমনি টিকেও অনেকদিন। আর ওয়াটার প্রুফ রেটিং ও অনেক বেশী, প্রায় ৩০০০-৪০০০মিমি হয়ে থাকে। এই ধরনের ফ্যাব্রিকের তৈরির খরচ বেশী বিধায় তাবুর দাম কয়েকগুন বেড়ে যায়।

 

এছাড়াও কাপড়ের সেলাই গুলির ভিতরের দিকে পাতলা একটা প্লাস্টিক বা রাবারের টেপ হিট ও প্রেশার দিয়ে লাগানো থাকবে যেন সেলাই দিয়ে পানি না ঢুকে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে কিনলে ৪ সিজনের তাবু কিনাই ভালো, তাই না? না, ব্যাপারটা টিশারট না কিনে একেবারে সোয়েটার কিনার মত। ৪ সিজনের টেন্ট এ গরমের দিনে থাকতে কষ্ট হবে, কারন সেটা ঠাণ্ডার কথা ভেবে তৈরি। আবার ওজনও বেশী হবে ২ বা ৩ সিজনের থেকে।

 

 

 

আবার ৪ সিজনের টেন্ট পিচ করা ২ বা ৩ সিজনের টেন্ট এর থেকে বেশী সময় লাগে কারন অনেক বেশী পোল ও দড়ি থাকতে পারে।এইবার আসি মেটেরিয়ালের ব্যাপারে। সেইজে মারুতি আর টয়োটা গাড়ি। ভালো মানের কাপড় ও মজবুত পোল আপনাকে অনেক বছর ব্যাবহার এর নিশ্চয়তা দিবে, আবার কিছু কিছু বাড়তি জিনিস তাবু খাটানো ও খুলার কষ্ট কমায়ে দিবে, যেমন পোল গুলি যদি স্লিভ না হয়ে ক্লিপ সিস্টেম হয়। ফ্লায়ারের শেষ মাথা গুলি ঈলাস্টিক হুক না হয়ে যদি বাকল বা ক্লিপ সিস্টেম হয়। কিছু কিছু ব্যাপার তাবুতে আপনার থাকাকে আরামদায়ক করবে যেমন ভেতরের পকেট, মাথার উপর লাইট লাগানোর লুপ, সামনে ও পেছনে ভেস্টিবুল বা স্টোরেজ স্পেস, নেট এর দরজা, হেড স্পেস।

ভালো মেটেরিয়ালের উপর নির্ভর করবে তাবুর ওজন, ওজন বেশী মানেই ভালো ভাবার কোনই কারন নাই। কিছু কিছু তাবু শুধু ফ্লায়ার খাটানোর ব্যাবস্থা থাকে, ভালো আবহাওয়া হলে তখন বেশ আরাম করে থাকা যায়।তাহলে যা দাঁড়ালঃ

১। ব্যাবহারের উপর নির্ভর করে সিজন ঠিক করা
২। কাপড়ের (ফ্লোর ও ফ্লায়ার) ওয়াটার প্রুফ রেটিং দেখে নেয়া, কাপড়ের টাইপ ও লেয়ার দেখে নেয়া (পলিয়েস্টার/ নাইলন / রিপ স্টপ নাইলন, পি ইউ লেয়ার বা সিলিকন , ইত্যাদি ) , সিম সিল করা আছে কিনা দেখা।
৩। পোলের মেটেরিয়াল ও কোয়ালিটি দেখে নেয়া।
৪। অন্যান্য সুবিধা দেখে নেয়াঃ ক্লিপ সিস্টেম, ফ্লায়ার খাটানো, স্টোরেজ স্পেস, ভেন্টিলেশন, ইন্সেক্ট মেশ ইত্যাদি।

আশা করা যায় এইবার আপ্নারা তাবু কেনার সময় নিজেই যাচাই করে নিতে পারবেন কেনো একি সাইজের কোন তাবুর দাম ১০০০ টাকা আবার কোনোটা ১০,০০০ টাকা। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ি যতটুকু ভালো কেনা যায় দেখুন।

ফজলে রাব্বি,
২৬ জানুয়ারি ২০১৭
** কভার ছবিঃ সাখাওয়াত হোসেন

নীচের তাবু গুলি দেখতে পারেনঃ

New
New
New
New

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *